লামা রাবার ইন্ডাষ্ট্রিজের অবৈধ লিজ বাতিল ও ৪০০ একর জুম ভূমি রক্ষার দাবিতে ঢাকায় গোলটেবিল বৈঠক

0
156

রূপসীবাংলা৭১

“লামা রাবার ইন্ডাষ্ট্রিজ ও আমাদের ভূমি রক্ষার লড়াই” শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ বুধবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২ বিকাল ৩ টায় ঢাকা জাতীয় প্রেসক্লাবে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হল রুমে “লামা সরই ভূমি রক্ষা সংগ্রাম কমিটি” এই গোল টেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

গোলটেবিল বৈঠকে লামা সরই ভূমি রক্ষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক, রংধজন ত্রিপুরা’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, গবেষক ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মেঘনা গুহ ঠাকুরতা, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান, জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ও চট্টগ্রামস্থ সচেতন নাগরিক সমাজের যুগ্ম আহ্বায়ক ডা: সুশান্ত বড়ুয়া, বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সভাপতি হাসিবুর রহমান, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সম্পাদক ডা. ফয়জুল হাকিম (লালা), বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা: হারুনুর রশিদ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ, বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলনের সমন্বয়ক শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চার সভাপতি জাফর হোসেন, বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত প্রমুখ।

এতে সভা সঞ্চালনা করেন লামা সরই ভূমি রক্ষা সংগ্রাম কমিটির সদস্য মথি ত্রিপুরা এবং সভার প্রারম্ভে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন, লামা সরই ভূমি রক্ষা সংগ্রাম কমিটির সদস্য ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী যোহন ম্রো।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি জাতিসত্তাসমূহকে জাতি হিসেবে এখনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি জাতিসত্তাসমূহের ওপরে নিপীড়ন নির্যাতন , সম্পত্তি-জমি বেদখল করার জন্য পুরো অঞ্চলে সামরিকায়ন করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের পরবর্তীতে ’৮০ দশকে সমতল থেকে ৪ লক্ষের অধিক বহিরাগত সেটলার বাঙালিদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছিল। তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সে কারণে সেখানে প্রায় সময় জাতিগত সংঘাত জিয়ে রেখে সুফল ভোগ করছে। কারা সুফল ভোগ করছে তার একটি মাত্র চিত্র এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে পাহাড়ের পর পাহাড় সামরিক, বেসামরিক আমলা ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারা নামে-বেনামে হাজার হাজার ভূমি বেদখল করে আছে। প্রচলিত আইনকে ব্যবহার করে পাহাড়িদের প্রথাগত আইন কানুনকে উপেক্ষা করে মুনাফা লোভীরা সেখানকার জাতিসত্তাসমূহকে অস্বীকার করে, ভূমিন ওপর খবরদারি করে দখল করে বসে আছে। এই মুনাফা লোভীদের রক্ষার জন্য সেখানে শান্তি রক্ষার নামে ব্যাপক সামরিকিকরণ করা হয়েছে। প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে পাঁচতারকা হোটেল নির্মাণ, রিসোর্ট নির্মাণ করে বিশাল বাণিজ্যকরণ করা হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূ-বৈচিত্র্য, প্রাণ বৈচিত্র্যর সাথে রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ ভয়ঙ্কর আক্রমনাত্মক ধ্বংসকারী একটি জিনিস। সেটি সত্তর দশকে শুরু হয়েছিল অর্থকারী প্রজেক্ট হিসেবে। কিন্তু এর কারণে যে পরিবেশ, জীব বৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে তা বিবেচনা করে না।

তিনি বলেন, রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ যে শর্তগুলো রয়েছে তা লঙ্ঘন করে অবৈধ্যভাবে দখল করে আছে। কিন্তু সেখানকার আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরবতা পালন করছে। কোম্পানীর পক্ষে পক্ষালম্বন করছে। পানিতে বিষ প্রয়োগ করে পানিতে মারার জন্য চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা এই ঘটনায় রাবার ইন্ডাস্ট্রিজকে দায়ী করছি এবং এই ঘটনার সাথে জড়িতদের জনগণের আদালতে এনে বিচার করতে হবে। তিনি ভূমি রক্ষা কমিটি দাবির প্রতি সমর্থন জানান।

সুশান্ত বড়ুয়া বাংলাদেশের সামরিক বেসামরিক বাহিনীর কাজ কি সে প্রশ্ন তুলে বলেন, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের কাজ কি? যুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করা, রননীতি রনকৌশল ঠিক করা নাকি পাঁচ তারকা হোটলে নির্মাণ করা। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী কেন ব্যবসাতে জড়িয়ে পড়বে? বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ব্যবসাতে জড়িয়ে পড়া মানে আমাদের দেশের জন্য একটি অসম্মানের বিষয়।

তিনি আরো বলেন, লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ কর্তৃক লামার সরইয়ে পাহাড়িদের ভূমি বেদখল করা হচ্ছে, তাদের ওপর যে অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্যাতন করা হচ্ছে এগুলোকে ঠেকানো অতি জরুরী। তা না হলে এই পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে পড়বে। তিনি লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে সামাজিক, রাজনৈতিক, বুদ্ধিজীবি, পেশাজীবিসহ সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলার আহ্বান জানান।
লামা সরই ভূমি রক্ষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রংধজন ত্রিপুরা বলেন, লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ কেবল অন্যায়ভাবে পাহাড়িদের জমি বেদখল ও উচ্ছেদের অপরাধে জড়িত নয়, এই কোম্পানিটি প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের জন্যও দায়ি। গত ২৬ এপ্রিল লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ আমাদের যে জুম ভূমি পুড়িয়ে দেয় সেখানে সে সময় পুরো প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়ে যায়, বহু জীবের প্রাণ সংহার হয় এবং ছড়া ও ঝর্ণার পানি বিষাক্ত হয়। এ কারণে বর্তমানে আমাদের এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানি পাওয়া অত্যন্ত দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এই সব জঘন্য অপরাধে যাদের বিচার হওয়া উচিত সরকার ও প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ না নিয়ে বরং তাদের পক্ষাবলম্বন করে চলেছে। অপরদিকে আমরা যারা ক্ষতির শিকার হয়েছি, নিজ ভূমিতে পরবাসীর মতো দিন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছি, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হচ্ছে, তাদের উপর হামলা করা হচ্ছে। আমরা তিন পাড়াবাসী এখন গ্রেফতার, হামলা ও উচ্ছেদের ভয় ও আতঙ্কে বাস করছি।

তিনি লামা রাবার ইন্ডাষ্ট্রিজ ও স্থানীয় প্রশাসনের এইসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনে শরিক হয়ে পাশে থাকার জন্য দেশের সকল বিবেকবান মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন।

উক্ত গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকবৃন্দ লামা রাবার ইন্ডাষ্ট্রিজের অবৈধ লিজ বাতিল এবং কলাইয়া ঝিরির পানির উৎসে বিষ প্রয়োগ করে রেংয়েন ম্রো পাড়ার গ্রামবাসীদের হত্যা চেষ্টাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানিয়েছেন।

সর্বশেষ গত ৫ সেপ্টেম্বর ২০২২খ্রি: সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পেশকৃত নিম্নোক্ত দাবি জানানো হয়েছিল। গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকবৃন্দ একমত হয়ে আবারও একই দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

১) লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ কর্তৃক ভূমি বেদখল বন্ধ করতে হবে এবং ম্রো ও ত্রিপুরাদের ভোগ দখলীয় ৪০০ একর জুম ভূমিসহ কোম্পানি কর্তৃক বেদখলকৃত সকল জমি ফেরত দিতে হবে।

২) উক্ত কোম্পানির কর্মকান্ডের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ম্রো ও ত্রিপুরাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

৩) জুম ভূমি কেটে ও আগুনে পুড়িয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র ধ্বংস করা, অশোক বৌদ্ধ বিহারে হামলা ভাংচুর ও বুদ্ধ মূর্তি লুট, কলাইয়া ঝিরির পানিতে বিষ প্রয়োগ এবং ভূমি রক্ষা সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক রংধজন ত্রিপুরার উপর হামলার সাথে জড়িত কামাল উদ্দিন, মোয়াজ্জেম হোসেন, জহিরুল ইসলাম গং দের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দিতে হবে।

৪) কোম্পানি কর্তৃক ভূমি রক্ষা কমিটির নেতৃবৃন্দ ও গ্রামবাসীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

৫) বান্দরবানে রাবার ও অন্যান্য বাগান সৃজন কিংবা পর্যটন উন্নয়নের উদ্দেশ্যে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে দেয়া সকল জমির লিজ বাতিল করতে হবে।

উক্ত গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত থেকে সংহতি প্রকাশ করেছেন, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট লিগের কেন্দ্রীয় সদস্য শামীম ইমাম এবং লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও মানবাধিকার কর্মী ইলিরা দেওয়ান, সিএইচটি কমিশনের কো-অর্ডিনেটর অন্ময় চাকমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অমল ত্রিপুরা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জিকো ত্রিপুরা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দয়াসোনা চাকমা প্রমূখ। এছাড়াও উক্ত গোলটেবিল বৈঠকে লামা সরই ভূমি রক্ষা সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক রেংয়েন ম্রো (কারবারি), যুগ্ম আহ্বায়ক ফদরাং ত্রিপুরা (কারবারি) ও সদস্য ইংচঙ ম্রো প্রমুখ।

উল্লেখ্য, বিগত ৯ এপ্রিল ২০২২খ্রিঃ লামা সরই ইউনিয়নের ৩০৩নং ডলুছড়ি মৌজায় লামা রাবার ইন্ডাষ্ট্রিজ লিমিটেড কর্তৃক ত্রিপুরা ও ম্রোদের ফলদ চারা, আনারস চারা, আম গাছ, জাম গাছ, কাঠাঁল গাছ, কলা গাছ, বাঁশ ও গাছ বাগানসহ ইত্যাদি কেটে সাবাড় করে এবং ২৬ এপ্রিল তা পুড়িয়ে দেয়া হয়। এর পর ভূমি রক্ষা কমিটির নেতৃবৃন্দ ও গ্রামবাসীদের নামে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা, হামলা, ঝিরির পানির উৎসে বিষ প্রয়োগসহ সকল ধরণের অপচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে