২১ আগস্ট গ্রেনেট হামলায় শহীদ মোস্তাক আহমেদ সেন্টু ছিলেন আপ্যায়ন প্রিয়মানুষ

0
102

রুপসীবাংলা ৭১

২০০৪ সালের গ্রেনেট হামলা বিশ্বের আলোচিত একটি ঘটনা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত একটি সমাবেশে এই গ্রেনেট হামলা হয়। জনশ্রুতি রয়েছে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করতেই  এই গ্রেনেট হামলা করা হয়। সেই হামলার প্রেক্ষাপট পরবর্তী বিচারসহ সব কিছুই আমাদের জানা আছে। নতুন প্রজন্মও প্রতি বছর ২১ আগস্ট এলে সভা, সেমিনারের মাধ্যমে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হয়।

আপনারা অবশ্যই অবগত আছেন ২১ আগস্ট গ্রেনেট হামলায় শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে গিয়ে শহীদ হন তৎকালীন আওয়ামী লীগের উপ কমিটির সদস্য মোস্তাক আহমেদ সেন্টু। তার গ্রামের বাড়ী বরিশাল জেলার মুলাদী উপজেলার রামারপোল গ্রামে। আমিও ঐ একই উপজেলার বাসিন্দা। ওখানেই আমার সাংবাদিকতা শুরু ১৯৯১ সাল থেকে।মুলাদী থেকেই মোসতাক আহমেদ সেন্টুর নানা গল্প শুনতাম লোকমুখে। বিশেষ করে রাজনীতিতে তার সাহসীকতা, মানবিকতা ও বন্ধুসুলভ আচরণের কথা। প্রায়ই মুলাদীতে আওয়ামী লীগের নানা কমূসূচিতে অংশগ্রহণ করতেন মোস্তাক আহমেদ সেন্টু ভাই।

১৯৯৬ সালে ঢাকায় এসে সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত হলেও কখনও সেন্টু ভাইর সাথে আমার সরাসরি দেখা ও কথা হয়নি। এরই মধ্যে চলে এসেছে ২০০১ সাল। সারাদেশে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা। তখন জাতীয় সংসদের বরিশাল-৩ আসন ছিল মুলাদী ও হিজলা উপজেলা নিয়ে। একদিন আমার বন্ধু মুলাদী প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক বর্তমানে ঢাকা ওয়াসায় কর্মরত। মুক্তি মাহমুদ আমাকে অনুরোধ করেন বিকালে ১০ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে যেতে। আমাকে বলল, সেন্টু ভাইর সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে। যেহেতু নির্বাচনী সংবাদ প্রকাশ করার জন্য প্রার্থীদের তথ্য আমার প্রয়োজন সেহেতু রাজী হয়ে গেলাম। মোস্তাক আহমেদ সেন্টু ভাই তখন বরিশাল-৩ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ব্যাপক আলোচনায়। আমি তখন দৈনিক সবুজ বাংলায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত। ৯নং পাটুয়াটুলি অফিস থেকে বাদ আসর চলে আসি বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগের অফিসের সামনে। সড়কের মাথায় ঢুকতেই মানুষের জটলা চোখে পড়ল। আমার পরিচিত ২/৪ জনকে দেখতে পেলাম। আমাকে পেয়ে সবাই কুশল বিনিময় করতে করতে বন্ধু মুক্তি মাহমুদকে পেয়ে গেলাম। ভিড় দেখেই বুঝতে পারলাম এখানেই আছে আমাদের মোস্তাক আহমেদ সেন্টু। বন্ধু মুক্তি মাহমুদ আমার হাত ধরে ভিড় ঠেলে সেন্টু ভাইর কাছে নিয়ে গেলো। পরিচয় করিয়ে দিতেই সেন্টু ভাই বলল, আরে তুমি? তোমার কথা অনেক শুনেছি। কাছে টেনে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আমার একটা হাত তার একটা হাত দিয়ে ধরে রেখে উপস্থিত মুলাদী জেলার সাধারণ মানুষ, যুবক, ছাত্র, জনতার সাথে নির্বাচন প্রসঙ্গসহ নানা বিষয়ে কথা বলতে থাকলেন।

মাগরিবের ঠিক পর মুহুর্তেই সবাইকে বলল, চল লুচি খেতে যাই। সবাই বুঝল কোন জায়গায় যেতে হবে। কিন্তু আমি নতুন তাই বুঝতে পারলাম না কোথায় যেতে হবে। সেন্টু ভাইও আমার হাত ছাড়ছেন না। আমাকে নিয়ে উঠল তার বাড়ীতে। পাশে বসিয়ে নির্বাচনী নানা আলোচনা। গন্তব্যে যেতেই সাইন বোর্ড দেখলাম মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প। এখানকার লুচি আর কাবাব নাকি খুবই মজাদার। সবাই খুব মজা করে যার যার মত লুচি আর কাবাব খেল। আমিও জীবনের প্রথম তাই পেট পুরেই খেলাম। সেই দিনের বহরে কতজন মানুষ ছিলেন আমার ঠিক মনে না থাকলেও শতাধিকের কম হবে না। এরপর চা চক্র। সবাই দাড়িয়ে চা খেল। সেন্টু ভাই কিন্তু আমার হাত ধরেই আছে। সবাইকে চোখের ইসারায় বললো সংসদ ভবনের দিকে যেতে। আমাকে গাড়ীতে বসিয়ে সোজা জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় যায়। যে বাসায় ঢুকলাম সে বাসায় ছিল তৎকালীন চীফ হুইপ আবু হাসনাত আব্দুল্লাহ সাহেবেরে বাসা। বিশাল ড্রইং রুম নিচে, উপরে থাকার ঘর। আমরা সবাই যেতেই কানাঘুষা এবার বরিশাল-৩ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাচ্ছেন মোস্তাক আহমেদ সেন্টু। উপর থেকে সাহানা আব্দুল্লাহ, যিনি এখন আমাদের মাঝে বেঁচে নেই। সেন্টু ভাইকে উপরে ডাক দিলেন, সেন্টু ভাই উপরে যেতেই শাহানা আব্দুল্লাহ তাকে নিজ হাতে মিস্টি খাইয়ে দিয়ে নিচে বসা সবার জন্য মিস্টি পাঠালেন।

সেন্টু ভাইর দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বললেন, তোমার জন্য ভালো খবর আছে। সবাই খুশিতে স্লোগান দিতে থাকলো জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। তারপর অনেক ইতিহাস। মনোনয়ন পেলেন না সেন্টু ভাই। এরপর মাঝে মাঝেই বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তার সাথে দেখা হতো। কুশল বিনিময় করে আপ্যায়ন করতেন। মূলত মোস্তাক আহমেদ সেন্টু ছিলেন একজন সদা হাস্যউজ্জ্বল আপ্যায়নপ্রিয় মানুষ। সেই সময় তার রানৈতিক বিষয়ে বেশকিছু রিপোর্টিং করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।২১ আগস্ট ২০০৪ আমার পারিবারিকভাবে হঠাৎ বাড়ী যাই। ২১ আগস্ট লঞ্চে ঢাকায় আসার কথা। সবকিছু গোছানো শেষ। লক্ষ করলাম গ্রামের একটু সচেতন মানুষ টিভির খোঁজে ছোটাছুটি করছে। কিছুই বুঝতে পারছি না। শুধু একজন বলল ঢাকায় আওয়ামী লীগের জনসভায় বোমা হামলা হয়েছে। লঞ্চে উঠে শুনলাম শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে গিয়ে অন্যান্যদের সাথে শহীদ হন মোস্তাক আহমেদ সেন্টু। নির্বাক হয়ে শুধু ভাবলাম ভালো মানুষ পৃথিবীতে কম সময়ই বাঁচে।আমি মোস্তাক আহমেদ সেন্টুর একদিনের ভালবাসায়ই মুগ্ধ হয়েছিলাম। পরবর্তীতে শহীদ মোস্তাক আহমেদ সেন্টুর বড় ভাই মোস্তাফিজুর রহমান নিলু ভাইর সাথে যোগাযোগ করে তাকে নিয়ে বিভিন্ন সংবাদ প্রচার করেছি। প্রতি বছরই সেন্টু ভাইকে নিয়ে এই স্মৃতিচারণটি লিখি। গত বছর তার সহধর্মীনির বাসায় তার স্ত্রী ও সন্তানদের সাক্ষাৎকারমূলক স্মৃতিচারণমূলক একটি ভিজুয়াল প্রতিবেদন প্রচার করি। মোস্তাক আহমেদ সেন্টু বেঁচে থাকুক আমাদের হৃদয়ে ও রাজনৈতিক অন্তরে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে