চিন্তা ও চেতনায় আজম খান

0
192

নিজস্ব প্রতিনিধি:- বহুসময়ের রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটালেন আজম খান। ৫ জানুযারী ২০২২ সংবাদ সম্মেরনের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবন থেকে অবসর গ্রহন করেন তিনি। জাতীয় প্রেসক্লাবের মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহন করেন।আজম খান একজন রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক, মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব এবং অসহায় প্রাণীদের প্রতি সদা দয়াশীল একজন জাতীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি ১৯৫৭ সালের ১০ এপ্রিল গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ভক্তারপুর ইউনিয়নের বেরুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মৃত ডা. ফজলুল করিম খান, রত্নাগর্ভা মাতা মোসা. খাতিমুন নেছা খানম। তিনি এদেশের রাজনীতিতে নানা চড়াই-উৎরাই এর মধ্য দিয়ে আজকের এই দিনে উপস্থিত হয়ে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। যেই সিদ্ধান্ত কিছুক্ষণ পরেই তিনি নিজেই আপনাদের সামনে উপস্থাপন করবেন। শিশু বেলা থেকেই প্রাণচঞ্চল আজম খান প্রথম শ্রেণী থেকে ৪র্থ শ্রেণী পর্যন্ত এয়ারপোর্ট ওয়েলফেয়ার স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ৪র্থ থেকে ৭ম শ্রেণী পর্যন্ত তেজগাঁও পলিটেকনিক হাইস্কুলে পড়াশুনা করেন। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সকল মিছিলে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

যেদিন শিবপুরে শহীদ আসাদ গণঅভ্যুত্থানের প্রথম সারির নেতা শহীদ হন সেই মিছিলেও তিনি অংশগ্রহণ করেন। তার বড় ভাই শহীদ সফিউদ্দিন খান পাকিস্তানী শাসনামলে এয়ারফোর্সে অফিসার ছিলেন। তার শিশু বয়সেই আন্দোলন-সংগ্রামের এই দুঃসাহসী কর্মকাণ্ডের জন্য তার রত্নাগর্ভা মায়ের নির্দেশে ১৯৭০ সালে করাচি নিয়ে যান। ৮ম শ্রেণীতে করাচি মৌরিপুর বাংলা মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনিসহ তার দুই ভাই করাচিতে বন্দী অবস্থায় থাকেন অন্য দুই ভাই সরাসরি বিদ্রোহ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। অন্য আরেক ভাই মা-বাবার সাথে দেশেই অবস্থান করছিলেন। আজম খানসহ তার ৬ ভাই এবং ৫ বোন। ৬ ভাইয়ের মধ্যে ৩ জন বিমান নৌবাহিনীকে কর্মরত ছিলেন। বাকী ৩ জন চাকুরীজীবী ও ব্যবসায়ী। ৫ মেয়ের মধ্যে একজন স্কুলের প্রধান শিক্ষক, একজন ইডেন কলেজের প্রভাষক, একজন চাকুরীজীবী ও ২ জন গৃহিণী।তার বড় ভাইকে ‘বেয়নেট’ দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। শহীদ শামসুল করিমকে ঢাকা সেনানিবাসে শামসুল করিম খানকে ভয়ংকর নির্যাতন করে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি সেনারা।

তিনি ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সার্জেন্ট। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মিলে মুক্তিযুদ্ধও করেছেন। একপর্যায়ে বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে তাকে আটক করে হানাদার পাকিস্তানি সেনারা। শহীদ সার্জেন্ট শামসুল করিম খানের গ্রামের বাড়ি গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বেরুয়া গ্রামে। তবে তার জন্ম মিয়ানমারে ১৯৩০ সালের ১ জানুয়ারি। তাঁর বাবা চিকিৎসক ফজলুল করিম খান চাকরিসূত্রে তখন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। শামসুল করিম ছিলেন অত্যন্ত সাহসী আপসহীন। উর্ধ্বতন পাকিস্তানি কর্তাব্যক্তিদের মোটেই তোয়াজ-তোষামোদ করতেন না। বরং বাঙালিদের প্রতি কোন কটুক্তি করলে তিনি উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ করতেন। এসব কারণে চাকরিতে তাঁর পদোন্নতি হচ্ছিল না। পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব পালনের পর ১৯৬৯ সালে সুযোগ আসে ঢাকায় কাজ করার।

পশ্চিম পাকিস্তানে থাকতে তিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত খোজ রাখতেন। এ সম্পর্কে তার স্ত্রী বেগম নিলুফার খানম স্মৃতিচারণায় একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। সত্তরের ঝড়ের রাতে হঠাৎ চারটার দিকে ঘুম ভেঙে দেখি তিনি নেই। খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। ঘণ্টা দেড়েক পর ফিরে এসে বললেন, এত চিন্তা করবে না। আমি একটু অফিসে গিয়েছিলাম। দেশ তো স্বাধীন আমাদের তাই দেখে এলাম সব ঠিকঠাক আছে কি না (স্মৃতি : ১৯৭১, রশীদ হায়দার সম্পাদিত, পুনর্বিন্যাসকৃত দ্বিতীয় খণ্ড, বাংলা একাডেমি)। গোপনে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন মিয়ানমারে থাকতেন। একাত্তরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি শামসুল করিমকে ১১ পাঞ্জাবি সেনার একটি দলের দলপতি করে গোলাবারুদসহ পাবনার ঈশরদীতে পাঠানো হয়েছিল। নিলুফার খানম তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, শামসুল হক গোপনে ঈশ্বরদীতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন।

একপর্যায়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর তাঁর দলের পাঞ্জাবি সেনাদের হত্যা করেন। গোলাবারুদ মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে দেন। সেখানে পাকিস্তানি সেনাদের একটি খাটিতে আক্রমণ করে উড়িয়ে দেন। বিষয়টি একটা পর্যায়ে ঢাকা সেনানিবাসে জানাজানি হয়ে যায়। তখন ঢাকা সেনানিবাসে থাকা তার স্ত্রী-সন্তানদের আটক রাখা হয়। পাকিস্তানি ঘাতক সৈনিকেরা সার্জেন্ট শামসুল করিমসহ বিমানবাহিনীর ছয় কর্মীকে আটক করে নির্মম নির্যাতন চালায়। একপর্যায়ে তাদের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। দেশের জন্য কিছু করার তাগিদ ছিল তার, নিজের জীবন উৎসর্গ করে তা সম্পন্ন করে গেছেন শহীদ সার্জেন্ট শামসুল হক খান।

ভাইয়ের খবর নিতে গিয়ে ৪র্থ ভাই শহীদ বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. সগির খান ক্যান্টনমেন্টের জাহাঙ্গীর গেটে খোঁজ নিতে গেলে সেখানে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের পর ফ্ল্যাইট লেঃ মির্জা ভাগ্যগুনে মুক্তি পান। তিনি তৎকালীন সময়ে একটি সাক্ষাতকার প্রদান করেন দৈনিক বাংলা পত্রিকায়। সেই সাক্ষাতকারের মাধ্যমে আজম খান ও তার পরিবার জানতে পারে ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত ‘বেয়নেট’ দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাদের দুই ভাইকে হত্যা করেন। তখন পাকিস্তানের করাচিতে আজম খানসহ অন্য ৩ ভাই বন্দীদশায় ছিলেন। ১৯৭১ সালের ৭ আগস্ট পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন আজম খান। তখন বিমান ভাড়া ছিল ১২৫ টাকা। তিনি বাংলাদেশে এসেই সরাসরি গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায় কমান্ডার আলী হোসেন তালুকদার ও ডেপুটি কমান্ডার সিরাজের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সেই সময় কালীগঞ্জের বাণীগাঁও ব্রীজে একটি অপারেশনে গিয়েছিলেন।

তখন তিনি ছোট থাকায় তাকে সম্মুখ যুদ্ধে উপস্থিত না করে নৌকার ভিতরেই অবস্থান করছিলেন। সেই যুদ্ধে অন্য যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম বীরমুক্তিযোদ্ধা আজিজুল হক কাঞ্চন, মিন্নত আলী মেম্বারের ছেলে আব্দুল হাই, ডেপুটি কমান্ডার সিরাজসহ অন্যরা। নৌকার মাঝি ছিলেন নজির আলী। তিনি ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর শেষ অপারেশনে যৌথ বাহিনীর সাথে ঢাকার দিকে গিয়েছিলেন। যখন এই বহর পুবাইল ব্রীজের একপাশে অবস্থান করে তখন তৎকালীন ভারতের ক্যাপ্টেন আর.পি সিং এর সাথে পরিচয় ঘটে। ভারতের ক্যাপ্টেন আর.পি সিং কিশোর বালক দেখে কিছুটা বিস্মিত হয়। তিনি তার কাছে এসে জানতে পারেন তার দুই ভাই বাংলাদেশে মিসিং এবং পাকিস্তানের অন্য দুই ভাই বন্দী রয়েছেন। তখন তিনি তাকে (আজম খানকে) অপারেশনে না নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বলেন। তিনি আরো বলেন, আজাদ কি বাদ হামকা সাথ মোলাকাত কর। হাম তোমারা মা কা সেলুট কারতা হ্যায়। মে উনকা সাথ জরুর মিলুঙ্গা। স্বাধীনতার পর পিলখানায় তৎকালীন ভারতের ক্যাপ্টেন আর.পি সিং এর সাথে সাক্ষাত করেন তিনি। তিনি তার টু আই সি বার্নিসিংকে দিয়ে আজম খানকে বিশেষ আপ্যায়ন করান এবং একসাথে ১৭টি ডিম মামলেট করে খাওয়ান এবং আপ্যায়ন শেষে আর্মির গাড়িতে করে আজম খানসহ তিনি তাদের কলাবাগানের বাসায় আসেন এবং তার রত্নাগর্ভা মা, শহীদ জননী খাতেমুন্নেছা খানমের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করেন এবং তাকে আর্মির ‘প্রটোকলে স্যালুট করেন’। যা আজো আজম খানের চোখের সামনে ভাসছে।

১৯৭২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি বহুবার কারাগারে গিয়েছেন এবং কারাবরণ করেছেন। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কলাবাগান শাখার সভাপতির পদ দিয়ে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। ১৯৭৯ সালের অবিভক্ত ঢাকা মহানগরের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময় তার কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন ডাকসু’র ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না। বর্তমানে তিনি গাজীপুর জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি এবং জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়ামের সদস্য। ইতিপূর্বে জাতীয় সাংস্কৃতিক পার্টির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তার উপলব্ধি থেকে বিশ^াস করেন বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনীতিবিদরা ‘দেহ ত্যাগ করলেও পদত্যাগ করেন না’। তিনি আজ সেই নজির সৃষ্টি করার জন্য আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছেন।

নিজেকে মানবসেবায় শতভাগ সম্পৃক্ত করতে চান। তিনি ঢাকা পদাতিক নাট্যগোষ্ঠির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আজম খান ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি ১০ হাজার মাটির ব্যাংক তৃণমূল পর্যায়ে বিতরণ করেন এবং লক্ষ লক্ষ টাকা সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। বিদেশী রেমিটেন্স আনয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন যুবকদেরকে বিদেশে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেন। তাদের কাছ থেকে ‘জিরো টাকায়’ তার জীবনে ৩০০ জন শ্রমিককে কাতারে পাঠান। এছাড়াও অন্যান্য দেশেও বেশ কিছু শ্রমিকদেরকে পাঠিয়েছেন। ৩ হাজারেরও অধিক যুবক-যুবতীকে চাকরি দিয়েছেন এবং এই ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

এছাড়া তিনি কোরআনের আলোকে কর্মমুখী শিক্ষার আলোকে ভবন নির্মাণকল্পে এক একর জমিতে ১৮ (আঠার) কোটি টাকা ব্যয়ে একটি কার্যক্রম শুরু করেছেন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে ৪ (চার) কোটি টাকা ব্যয়ে ১ লক্ষ বৃক্ষ রোপন করেছেন। এই কর্মসূচিও তিনি অব্যাহত রেখেছেন। মৎস্য খামার সৃষ্টি করে মাছ চাষীদের যেমন উদ্বুদ্ধ করছেন তেমনি এই খাত থেকেও শত শত বেকার যুবকদেরকে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছেন। তিনি বিশ^াস করেন তার যতটুকু প্রয়োজন সেটুকু রেখে তার অর্জিত বাকী সবটুকু সম্পদ ও অর্থ মানবকল্যাণে উৎসর্গ করবেন বলে আজ তিনি এখানে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি আরো বিশ্বাস করেন মানুষের মধ্যে সেই উত্তম যে মানুষের কল্যাণ করেন।

পশুদের প্রতি তার রয়েছে অন্যরকম প্রীতি। তিনি বিভিন্ন সময়ে তার অবস্থান থেকে সাধারণ মানুষের কাছে একটি আহ্বান জানান। আপনারা আপনাদের ঘরের খাবারের উচ্ছিষ্ট অংশ ডাস্টবিনে ফেলে দেবেন না। বরং আপনার চারপাশে কুকুর-বিড়ালকে এই উচ্ছিষ্ট অংশ দিয়ে দিন। এটিও যদি আপনাদের দিতে কষ্ট হয় তাহলে আমার হটলাইনে ফোন করুন। আমি সেই উচ্ছিষ্ট খাবারের অংশ অসহায় প্রাণী কুকুর, বিড়াল, খরগোষসহ তাদের মাঝে বিলিয়ে দেব। আপনারা যদি আপনাদের চারপাশে কুকুর, বিড়াল আশ্রয় দিতে না পারেন আমাকে বলবেন। আমি তাদের জন্য খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেব।

তিনি সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়নগঞ্জ- ১ ও নরসিংদী ২ থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন। তার স্ত্রী রাহেলা পারভীন শিশির গাজীপুর ৫ আসন থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন। গাজীপুর ৫ আসন তার নির্বাচনী এলাকা। তিনি এই এলাকায় গণমানুষের দুঃখ ও কষ্ট ভাগাভাগি করার জন্য নিজেকে সবসময় প্রস্তুত রাখেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে